সময় সকাল ৯:৫০, মঙ্গলবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১১ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

“সাকিব আল হাসান হতে ইচ্ছা করে”

সৌরভ দাস পার্থ

হবিগঞ্জ। সিলেট বিভাগের একটি জেলা। এই জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম বদলপুর। প্রায় সব ধরণের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েই বেড়ে উঠছে এই গ্রামের বাচ্চারা। তবুও ঐ গ্রামের কিছু সংখ্যক বাচ্চা এই সব প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে চায়, এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।

অপু চন্দ্র দাস সব ধরনের প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে চাওয়া ঐ সব বাচ্চাদের একজন। অপুদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৭। বাবা-বা, চারভাই-একবোন এদের সবাইকে নিয়েই অপুদের পরিবার।

অপুর সাথে আমার পরিচিত হওয়ার কথা ছিলো না। JAAGO Foundation ও SHOUT এর সহযোগিতায় Save the Children in Bangladesh-এর ‘Bridging the Gap’ নামক কার্যক্রম হচ্ছে ‘Every Last Child’ বিশ্বব্যাপী ক্যাম্পেইনের অংশ। এই কাজের সাথে যুক্ত হয়ে আমি দল বেঁধে হবিগঞ্জের পাহাড়পুরে গ্রামে যাই। সেখানেই অপুর সাথে আমার পরিচয়।

অপুর বাবা কৃষিকাজ করেন আর মা গৃহিনী। বোন সবার বড়। এই বছর ডিগ্রি পাস কোর্সের ফাইনাল পরীক্ষা দিলেন। পরিবারের কথা চিন্তা করে বড় ভাই পড়ালেখা বাদ দিয়েছেন অনেক আগে। তিনি এখন বাবার সাথে কৃষিকাজ করেন। বাকি দুই ভাই এর মাঝে একজন ষষ্ট শ্রেণীতে এবং আরেকজন তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ছে।

ভাই-বোনদের মাঝে অপু তৃতীয়। সে মাধ্যমিক পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে ৩.৬৭ পেয়েছে। তার মতে সে যদি তখন টিউশন পড়তে পারতো তাহলে পরীক্ষার ফল আরো ভালো হত। এখন সে পাহাড়পুর আদর্শ কলেজে মানবিক বিভাগে পড়ালেখা করছে। সে এখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।

অপুদের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা এতোটাই বাজে যে তাকে রোজ ৬ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে কলেজে আসতে হয়। ৬ কিলোমিটার ঐ পথ হাঁটতে তার সাতটা বড় বড় সাঁকো পার হতে হয়। বাড়ি থেকে কলেজে যাওয়া আসায় নৌকা ভাড়া ৪০ টাকা। কিন্তু ঐ টাকা দেয়ার ক্ষমতা ওর বাবার নেই।

অপু নিজের খরচ চালানোর জন্য একটা টিউশন পড়ায়। মাঝে মাঝে আবার বাবার সাথে ক্ষেতেও কাজ করে। আবার কখনও বা হাওড়ে মাছ ধরতে যায়।

অপুর বাবা চান অপু বড় হয়ে একজন প্রাইমারি স্কুলের টিচার হবে। মা চান সে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অফিসার হবে। আর বড়ভাইএর ইচ্ছা অপু পুলিশের একজন এস.আই. হবে। কিন্তু অপু হতে চায় কলেজের প্রফেসর। সে ইংলিশ পড়াতে চায়। সে পড়তে চায় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

অপুদের এলাকায় বিশুদ্ধ পানির কোনো নলকূপ নেই। বেশীরভাগ নলকূপেই আর্সেনিকযুক্ত পানি। সব সময় ফুঁটিয়ে পানি খাওয়া সম্ভব হয় না তাই বিভিন্ন ধরণের পীড়ায় ভুগতে হয়। ছোটখাটো অসুখে গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে যায়। ঐখানে ডাক্তার না পেলে আজমেরিগঞ্জে যেতে হয়। পায়ে হেঁটে আজমেরিগঞ্জ যেতে দুইঘন্টা সময় লাগে। নৌকায় দেড়ঘন্টা আর শুকমা মৌসুমে গাড়িতে করে এক ঘন্টা লাগে।

অপুর একটা বড় সমস্যা আছে। গত তিনবছর ধরে ওর প্রায়ই প্রচন্ড মাথাব্যথা হয়। কিন্তু টাকার অভাবে ভালো ডাক্তার দেখাতে পারছে না।
অপুর প্রিয় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। যদিও সে ভালো ক্রিকেট ভালো খেলতে পারে না তাও তার প্রায়ই সাকিব আল হাসান হতে ইচ্ছা করে। কারণ সাকিব আল হাসানকে সবাই চিনে।

অপু জানে ও একজন সুবিধাবঞ্চিত শিশু। কিন্তু ও দমে যেতে চায় না। ও চায় সবাই ওকে চিনুক। সবাই জানুক ও কিভাবে কষ্ট করে বেড়ে উঠছে। কিভাবে প্রতিটা বাঁধাকে পদদলিত করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।

সম্পাদকঃ  অনুজিত সরকার
প্রকাশকঃ মুহাম্মদ রকিবুল হাসান
ই-মেইলঃ [email protected]

কপিরাইট © ২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক রাজবাড়ী