• মনোনয়ন পেতে কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হবে লতিফকে।
• লতিফ যাতে মনোনয়ন না পান সে জন্য একটি অংশ তৎপর।
• আ.লীগ থেকে মনোনয়ন চান খোরশেদ, আলতাফ ও ইলিয়াস।
• বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন আমীর খসরু।
তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি। ব্যবসায়ী মহলে তাঁর পরিচিতি ছিল ‘আওয়ামীবিরোধী’ হিসেবে। সেই এম এ লতিফ ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে পতেঙ্গা ও বন্দর আসনে (চট্টগ্রাম-১১) আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে চমক সৃষ্টি করেন। আর চারবারের সাংসদ ও বিএনপির বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে পরাজিত করে আলোচিত হন।
তবে এবার মনোনয়ন পেতে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে নানা কারণে দলে বিতর্কিত হয়ে পড়া এম এ লতিফকে। আওয়ামী লীগের সাংসদ হলেও নেতা-কর্মীদের একটি অংশ তাঁকে জামায়াতের লোক মনে করেন। জামায়াত-সমর্থিত একটি সংগঠনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনও করেছেন নেতা-কর্মীরা। আগামী নির্বাচনে লতিফ যাতে মনোনয়ন না পান, সে জন্য নগর কমিটির একটি অংশ চেষ্টা চালাচ্ছে। এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চান চট্টগ্রাম নগর কমিটির দুই সহসভাপতি খোরশেদ আলম ও আলতাফ হোসেন চৌধুরী এবং নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াস। অন্যদিকে এবারও এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু।
২০১৪ সালের ‘একতরফা’ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয়বার সাংসদ হন এম এ লতিফ। মূলত দ্বিতীয় মেয়াদেই বিতর্কে জড়ান তিনি। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চট্টগ্রাম সফরের সময় লতিফের উদ্যোগে লাগানো পোস্টার ও প্ল্যাকার্ডে বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতির অভিযোগ ওঠে। তখন রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও তাঁর অনুসারীরা। লালদীঘি ময়দানে লতিফের বিরুদ্ধে সমাবেশও করেছিলেন তিনি। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর মহিউদ্দিন চৌধুরী মারা যাওয়ার পর তাঁর পরিবার ও অনুসারীদের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে উদ্যোগ নিয়েছেন লতিফ।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২৭ থেকে ৩০ এবং ৩৬ থেকে ৪১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে এ আসনটি গঠিত। পতেঙ্গা, বন্দর, সদরঘাট ও ইপিজেড থানা এবং ডবলমুরিং থানার একাংশ পড়েছে চট্টগ্রাম-১১ আসনে।
পরীক্ষার মুখে লতিফ
চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগে দুটি ধারা। একটির নেতৃত্বে ছিলেন প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরী। এখন তাঁর ছেলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী এই ধারার অঘোষিত নেতা। অন্য ধারার নেতৃত্বে আছেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। মেয়র নাছিরের সঙ্গে সাংসদ লতিফের একসময় উষ্ণ সম্পর্ক ছিল। বর্তমানে শীতল সম্পর্ক চলছে। এ কারণে মহিউদ্দিনের অনুসারীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছেন লতিফ।
সাংসদ লতিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৮ সালে আমি আওয়ামী লীগে স্ট্রেইঞ্জার (আগন্তুক) ছিলাম। ওই সময় তৃণমূল আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধভাবে আমাকে জিতিয়েছে। আমি এখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী শেখ হাসিনার সৈনিক।’ সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিযোগিতা থাকবে। তবে কখনো গ্রুপিংয়ের রাজনীতি করিনি। তৃণমূল আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকেরাও গ্রুপিং করেন না। তাঁরা নৌকায় ভোট দেন। তাঁদের সমর্থন নিয়েই রাজনীতি করি।’
২০০৮ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ আসনে প্রথমে দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাঁকে বাদ দিয়ে লতিফকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। লতিফ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবেন এবং সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে চট্টগ্রাম বন্দরকে সচল রাখতে পারবেন-মূলত এই বিবেচনাতেই মনোনয়ন পান বলে মনে করেন কর্মীরা।
এ বিষয়ে খোরশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৮ সালে আমাকে মনোনয়ন দিয়ে প্রত্যাহারের পেছনে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের ভূমিকা ছিল। অথচ লতিফ কখনো আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করেছেন তিনি। দলের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নেই।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সাংসদ হলেও এম এ লতিফ জামায়াতের সমর্থক। আগ্রাবাদে জামায়াত-সমর্থিত একটি সংগঠনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। সাংসদ হয়ে তিনি শুধু নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন।
সাংসদ হওয়ার পর এম এ লতিফ আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে এলাকায় জামায়াতের জন্য কাজ করছেন বলে অভিযোগ করেন শ্রমিক লীগের নেতা ও চট্টগ্রাম নগরের গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
মনোনয়নপ্রত্যাশী মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, পরিকল্পিত উন্নয়ন করতে হলে নেতৃত্বের পরিবর্তন প্রয়োজন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা এই নির্বাচনী এলাকায়। প্রার্থী হওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
বিএনপিতে খসরুর বিকল্প নেই
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এই আসন থেকে (তখন ছিল চট্টগ্রাম-৮) সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। খালেদা জিয়া আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে সাংসদ হন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও জয়ী হন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তন হলে হালিশহর, পাহাড়তলী ও খুলশী থানা অন্য আসনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পতেঙ্গা-বন্দর-ইপিজেড-সদরঘাট নিয়ে চট্টগ্রাম-১১ আসনটি গঠিত হয়।
তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বলেন, এখন পর্যন্ত আমীর খসরুর কোনো বিকল্প নেতা এই আসনে নেই। তবে তাঁর পৈতৃক নিবাস নগরের কাট্টলীতে। এটি এখন (চট্টগ্রাম-১০) আসনের অন্তর্ভুক্ত। সেখানেও নির্বাচন করতে পারেন তিনি। ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম-১১ থেকে নির্বাচন করব কি না, সেটা এখনো বলার সময় আসেনি। সবকিছু আমার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না।’
চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম প্রথম আলোকে বলেন, পতেঙ্গা-বন্দর আসনে বিএনপিতে বিকল্প আর কোনো প্রার্থী নেই। ১৯৯১ সাল থেকে আমীর খসরু ওই আসনে চারবার জিতেছেন।
