নরেন্দ্র মোদি এবং সি চিন পিং
চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে একেবারে ভিন্ন কায়দায় বৈঠক করলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৈঠকের সময় তাঁদের সঙ্গে সহযোগী কেউ ছিলেন না। কোনো লিখিত নোট নিয়েও তাঁরা আলোচনায় বসেননি। বৈঠক শেষে নেতারা সাধারণত যৌথ বিবৃতি দিয়ে থাকেন। কিন্তু সেটিও তাঁরা দেননি। সাংবাদিকদের আগেই বলা হয়েছিল, এই বৈঠকে কোনো অ্যাজেন্ডাই থাকছে না।
আসলে কিন্তু একটি বড় অ্যাজেন্ডা ছিল। সেটি হলো ভারত ও চীনের দূরত্ব যথাসম্ভব দূর করে একটি কূটনৈতিক ভারসাম্য ধরে রাখা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতের মুখে কাদা ছিটানো থেকে চীনকে বিরত রাখা। আগামী বছরই ভারতে সাধারণ নির্বাচন।
এর আগে দুই দেশের মধ্যে যাতে কোনো উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সেটি নিশ্চিত করাও মোদির অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে হয়। গত বছর চীনের বিরুদ্ধে ভারতের নেতারা যেভাবে উত্তপ্ত বক্তব্য দিয়েছেন, এখন আর তাঁরা সে ধরনের কিছু বলছেন না। ভারতীয় কর্মকর্তারা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভেরও (বিআরআই) সমালোচনা না করে চুপ করে আছেন।
গণতান্ত্রিক ভারতের উদার মূল্যবোধে আমরা যাঁরা বিশ্বাস করি, তাঁদের জন্য সম্প্রতি চীন খুব অস্বস্তিকর একটি বিষয় চাপিয়ে দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দেশটির শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিকেরা ভারতে তাঁদের প্রতিপক্ষদের একটি চিঠিতে বলেছেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে একটি ‘স্পর্শকাতর সময়’ যাচ্ছে। তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার চীন থেকে ভারতে এসে আশ্রয় নেওয়ার ৬০ বছর পূরণ উপলক্ষে আয়োজিত কোনো ধরনের অনুষ্ঠান থেকে ভারতীয় কর্মকর্তারা যেন দূরে থাকেন। নয়তো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মোদির সর্বশেষ চীন সফরের বিষয় ঠিকঠাক করতে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব যখন বেইজিং যান, ঠিক তখনই চীনের কর্মকর্তারা ভারতের কর্মকর্তাদের এই ‘উপদেশ’ দিয়েছিলেন।
মোদির চীন সফরের সিদ্ধান্তকে অনেকেই হয়তো সময়োপযোগী উপলব্ধি হিসেবে মনে করে এটিকে স্বাগত জানাবেন। কিন্তু বিষয়টি একটু তলিয়ে দেখা দরকার। এশিয়ার এই দুই পরাক্রমশালী দেশের মধ্যে ক্ষমতা ও প্রভাবের তারতম্য এখনো অনেক। ক্ষমতা ও প্রভাবের দিক থেকে ভারত যে অনেকটাই পিছিয়ে, তা সবার কাছেই স্পষ্ট।
এ বছরের শুরুতে মালদ্বীপের ঘটনা সেটি আরও একবার প্রমাণ করেছে। একসময় মালদ্বীপ ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। কিন্তু নাটকীয়ভাবে দেশটি চীনের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ফেলে এবং দেশটি ভারতবান্ধব গণতান্ত্রিক মডেল থেকে সরে এসে কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক মডেলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। দেখা গেল, মালের খুবই কমসংখ্যক রাজনৈতিক নেতা ভারতকে সমর্থন করেছেন।
চীনের তুলনায় ভারতের পক্ষে মালদ্বীপে আর্থিক বিনিয়োগ খুবই সামান্য। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, যে ভারত মহাসাগরকে ভারত এত দিন তাদের ‘প্রাইভেট লেক’ হিসেবে জেনে এসেছে, সেখানে প্রথমবারের মতো চীন তাদের নৌবাহিনীর একটি গ্রুপ পাঠিয়েছে।
ভারতের নীতিনির্ধারকেরা এখন উভয়সংকটে পড়েছেন। একদিকে চীনকে মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ তাঁদের নেই। কিন্তু পিছপা হওয়ারও পথ নেই। পিছু হটলেই চীনের কৌশলের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নেওয়া হবে। আর সেটি হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ভারতের প্রভাব কমে যেতে থাকবে। এমনিতেই ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। হাডসন ইনস্টিটিউটের অপর্ণা পান্ডে দেখিয়েছেন, চীন কয়েক দশক ধরে যে অস্ত্র রপ্তানি করে, তার ৬০ শতাংশই যায় পাকিস্তান, মিয়ানমার ও বাংলাদেশে।
চীনের সঙ্গে মোদি সরকারের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে এই বার্তা যাবে যে ভারত চীনের সঙ্গে কোথাও টক্কর দেওয়ার সামর্থ্য রাখে না। এ কারণেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আগে এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, তা ভারতের নেতাদের ভেবে দেখতে হবে। অতীতে জাপান এবং আমেরিকার সঙ্গে একই ধরনের আপস করার জন্য যে খেসারত দিতে হয়েছিল, চীনের ক্ষেত্রেও কি সে রকম হবে? যদি সে রকমই হয়, তাহলে ভারতের সামনে কি বিকল্প কোনো পথ আছে?
অনেকেই মনে করেন, হ্যাঁ, আছে। ভারত সুদীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ ভোগ করে আসছে। তার উচিত নিজের সেই আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখা। পাশাপাশি চীনের মতো যেসব শক্তি আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, তাদের সঙ্গে ভারতের দূরত্ব বজায় রেখে চলা উচিত। সহজ কথায়, মোদি সরকারের উচিত চীনের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার চেষ্টা বাদ দিয়ে এশিয়া ও এশিয়ার বাইরের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা।
ব্লুমবার্গ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত
মিহির শর্মা: ব্লুমবার্গের নিয়মিত কলাম লেখক
