সময় বিকাল ৫:৪৯, মঙ্গলবার, ২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

টেলিছবির শুরু এবং অতঃপর…

শিল্পী রবি চৌধুরী দীর্ঘদিন পর সরাসরি প্রচারিত একটি সংগীতানুষ্ঠানে গান গাইলেন। অনুষ্ঠানটির নাম আজ সকালের গানে। প্রচারিত হলো ২৭ এপ্রিল সকাল ৮টা ১০ মিনিটে এনটিভিতে। তিনি একটানা প্রায় দুই ঘণ্টা গান করেছেন এই অনুষ্ঠানে। অধিকাংশই করেছেন নিজের গান, এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তাঁর পরিবেশিত গানগুলোর মধ্যে ছিল, ‘আমি বারবার প্রতিবার শুধু তোমার কাছেই হেরেছি’, ‘ও সজনী রজনীকে যেতে দিও না’, ‘বিরহের সে সুর সেধেছি’, ‘জীবনের বারোটা বাজিয়ে রাতের বারোটায় এসে বলো’ ইত্যাদি। বিভিন্ন আঙ্গিকের গান করেছেন তিনি, এর মাঝে গজল আঙ্গিকের গানগুলো ছিল বেশ হৃদয়স্পর্শী। তাঁর কণ্ঠ সুরেলা, মিষ্টি এবং বেশ প্রাণবন্ত; যে কারণে দর্শকেরা অনুষ্ঠান দেখে ফোন করে তাঁদের অনুভূতি জানিয়েছেন। তবে তিনি উপস্থাপনায় ও কথোপকথনে মাঝে মাঝে হেঁয়ালি ও কৌতুক করেছেন, এটি পরিহার করলে আরও ভালো হতো। আর গানের প্রতি ভক্তি, সাধনা ও নিবেদনে মাঝে মাঝে যে খামখেয়ালিপনা প্রকাশ করেছেন, সেটিও বর্জন করা উচিত ছিল। অধিকাংশ গানেই গীতিকার ও সুরকারের নাম বলেননি, এটি শিল্পীর কাছে দর্শক প্রত্যাশা করে। আর সরাসরি প্রচারিত এ ধরনের অনুষ্ঠানে শিল্পীর কাছে দর্শক আরেকটু বিনয় ও আন্তরিকতা প্রত্যাশা করে। আশা করি ভবিষ্যতে তিনি এটি স্মরণ রাখবেন।

এবারে টেলিছবি। আমরা এই সপ্তাহে প্রচারিত দুটি টেলিছবি নিয়ে আলোচনা করব, এর মধ্যে একটি নতুন, অন্যটি পুনঃপ্রচারিত। ২৬ এপ্রিল রাত ১১টায় এটিএন বাংলায় প্রচারিত হলো সাপ্তাহিক টেলিছবি এক্সচেঞ্জ। রচনা ও পরিচালনা জুনায়েদ বিন জিয়া। অভিনয়ে চিত্রনায়ক রিয়াজ, সুজানা প্রমুখ।

গল্প বলতে যা বোঝায়, টেলিছবিটিতে ঠিক তেমন কোনো গল্প ছিল না। ছিল কিছু ঘটনার দৃশ্যায়ন। ছবিতে রিয়াজ ও সুজানা দুজন স্বামী-স্ত্রী। তাদের ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক জীবনের ঘটনাগুলোই দৃশ্যপরম্পরায় সাজানো হয়েছে টেলিছবিটিতে। সেই ঘটনার মধ্যেও কিছু দৃশ্যের সমন্বয়ে যে গল্পটি সাজানোর চেষ্টা করেছেন নির্মাতা, তা আবার দেখানো হয়েছে দুবার। একবার সেটি রিয়াজ দেখে স্বপ্নের মধ্যে। আবার সেই দৃশ্যগুলোই দেখানো হয় বাস্তবে ঘটছে বলে। একই ঘটনা দুবার দেখানোর ফলে তা তো আবেদন জাগাতে পারেইনি, বরং তা হয়ে উঠেছে বিরক্তিকর।

শুধু দৃশ্যের পুনরাবৃত্তিই নয়, রিয়াজ ও সুজানার অনেক সংলাপেও পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন নির্মাতা। এ ছাড়া কিছু দৃশ্যায়ন কেবল দুর্বলই নয়, অবাস্তব এবং হাস্যকরও মনে হয়েছে। যেমন সুজানা নিয়মিত একটি সাংস্কৃতিক একাডেমিতে যায়। সেখানে তার পরিচয় কী, তা স্পষ্ট নয়। আবার বলা হয়েছে একাডেমির অডিটরিয়ামে সে গান করবে, কিন্তু গানের সময় দেখানো হলো একটি রুমের মাঝে কয়েকটি চেয়ার দিয়ে কয়েকজন দর্শক। আবার রিয়াজ অনেক বড় ব্যবসায়ী, আজ তার অনেক বড় প্রেজেন্টেশন। সেখানে রুমের যে অবস্থা ও অংশগ্রহণকারীদের যে হালহকিকত দেখানো হয়েছে, তা মোটেই বাস্তবসম্মত হয়নি। শেষে বলব নামকরণের কথা। বাংলা টেলিছবির নাম রাখা হয়েছে ইংরেজি ভাষায়। তাতেও লেখক ও নির্মাতার তৃপ্তি হয়নি বলে পর্দায় কলাকুশলীদের নামটি পর্যন্ত দেখানো হয়েছে ইংরেজিতে। মনে হয়েছে, এটি যেন বাঙালি দর্শকদের জন্য নির্মিত নয়। বড়ই দুর্ভাগ্যজনক।

পাশাপাশি এবার পুনঃপ্রচারিত যে টেলিছবিটির কথা বলব, তার নাম জ্যোৎস্না ও জল, প্রচারিত হলো ২৮ এপ্রিল দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে এনটিভিতে। রচনা করেছেন তৌকীর আহমেদ এবং পরিচালনা করেছেন আরিফ খান। অভিনয়ে বিপাশা হায়াত, মাহফুজ আহমেদ, তৌকীর আহমেদ, আবুল হায়াত, ডলি জহুর, তারিন প্রমুখ।

জ্যোৎস্না ও জল টেলিছবির প্রাণই হলো গল্প। কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রাম্য পরিবারের কর্তা হায়াতের বংশরক্ষার তাগিদে জ্যোৎস্নার স্বামী মাহফুজ দ্বিতীয় বিয়ে করে। প্রিয়তম স্বামী ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। জ্যোৎস্নার জীবন থেকে হারিয়ে যায় সুখ, স্বপ্ন, স্বস্তি, ভালোবাসা সব। একপর্যায়ে স্বামী-সংসার থেকে তালাকপ্রাপ্ত ও বিতাড়িত হয় জ্যোৎস্না। তারপর জ্যোৎস্না মা হয়। বাবার নবীন সহকর্মী স্কুলশিক্ষক তৌকীরকে ঘিরে আসে নতুন জীবনের হাতছানি। এর মাঝে শ্বশুর ও স্বামীর পরিবারে নামে বিপর্যয়। মাহফুজের দ্বিতীয় স্ত্রী তারিন হয় সন্তান জন্মদানে ব্যর্থ ও মৃত্যুপথযাত্রী। তারা আবার জ্যোৎস্নার দ্বারস্থ হয়। জ্যোৎস্না তাদের প্রতি করুণার হাত বাড়ায় মাত্র, কিন্তু পুনর্বিবাহের প্রস্তাব দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে। গল্পটি শেষ হয় এখানেই। কিন্তু তারপরও মনে ঘুরপাক খায় নানা প্রশ্ন, কারণ জ্যোৎস্নার কোলে এখনো ওই পরিবারের সন্তান।

গল্পের প্রতিটি বাঁকে দর্শক খুঁজে পায় অভিনব নাটকীয়তা। তৌকীর আহমেদ চমৎকার একটি গল্প উপহার দিয়েছেন এই টেলিছবিতে। আর সেই গল্পকে বাস্তব ও হৃদয়গ্রাহী করে তোলার জন্য নির্মাতা আরিফ খান যে চেষ্টা ও শ্রম দিয়েছেন, যে দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। দেখলেই বোঝা যায়, নাট্যকার, নির্মাতা, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই টেলিছবিটি হয়েছে দর্শকনন্দিত এবং সফল।

আমরা ইচ্ছাকৃতভাবেই এবার দুই সময়ের দুটি টেলিছবির আলোচনা করছি। কারণ, যেসব নির্মাণের মধ্য দিয়ে টেলিছবির গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তা যেন আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। অচিরেই এসব সফল নির্মাণের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে টেলিছবির এই ধারা আবার সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়াবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

সম্পাদকঃ  অনুজিত সরকার
প্রকাশকঃ মুহাম্মদ রকিবুল হাসান
ই-মেইলঃ [email protected]

কপিরাইট © ২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক রাজবাড়ী