
রাজবাড়ী ঃ দরিদ্র পরিবারে জন্ম রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাবুলতলা গ্রামের লোকমান হোসেনের ছেলে মোঃ ফরিদ হোসেনের। যখন বুঝতে শুরু করেছে তখন থেকেই পিতার সাথে দু’মুঠো ভাতের জন্য পরের জমিতে কৃষি কাজ করতে হয়েছে। কোন দিন আধা পেট, আবার কোন দিন না খেয়ে কেটেছে তার পরিবারের। সঞ্চয় ছিল দু:স্বপ্নের মতো। ভেবেছিলেন জীবনটা এভাবেই কেটে যাবে। কিন্তু তার সে দুর্দিন আর নেই। সরকারের ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প বদলে দিয়েছে তার জীবন।
ফরিদ হোসেন প্রকল্পের অধীনে বাবুলতলা গ্রাম উন্নয়ন সমিতির সদস্য। সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ী সংলগ্ন ক্ষুদ্র আকারে মৎস্য চাষ শুরু করেন। ২য় ধাপে ঋণ নিয়ে একটি মুরগী খামার গড়ে তোলেন। খামার পরিচালনা করে ফরিদ হোসেন বেশ লাভবান এবং এ খামার থেকে লভ্যাংশের টাকা দিয়ে এবং সমিতি হতে ৩য় বার ঋণ নিয়ে বাড়ির পাশে একটি পুকুরে মাছের চাষ করে। এভাবে ফরিদ হোসেনের পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরে আসে। এলাকার লোকজন ফরিদের অবস্থা দেখে খুব খুশি এবং তারাও ফরিদের মত খামার ভিত্তিক কাজ পরিচালনা করতে চায়।
উপজেলার নারুয়া গ্রাম উন্নয়ন সমিতির সুবিধাভোগী মোছা: আঞ্জু। ছেলে-মেয়ে নিয়ে অনেক কষ্টে কাটছিল তার জীবন ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্পের আওতায় আর্থিক অনুদান নিয়ে তিনি একটি গাভী, হাঁস-মুরগি পালন শুরু করেন। স্বামী-স্ত্রীর প্রচেষ্টায় খামারের মাধ্যমে আর্থিক অনটনতো দূর হয়েছে, দুই ছেলে মেয়েকেই স্কুলে পড়াতে পারছেন। পরিবারে এসেছে স্বচ্ছলতা।
রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্পের আওতায় ৪ হাজার ৫ শত ৩১টি পরিবার দারিদ্র্যের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেয়েছে। তাদের জীবনে দেখা দিয়েছে স্বস্তি আর শান্তি। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য আগের মতো তাদের তাড়িত করে না। আর্থিক অনুদানের পাশাপাশি মিলেছে ক্ষুদ্র ঋণও। সঞ্চয়ের জন্য পেয়েছেন আর্থিক সুবিধা। ফলে তাদের আর্থিক দৈন্যতা ঘুচে গেছে।
একটি বাড়ী, একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে যেমন গ্রামের হাজার হাজার দরিদ্র পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেছে, ঠিক তেমনি দেশের বেকাত্বদূরীকরণে ব্যাপক ভূমিকাও রেখেছে এই প্রকল্প। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই প্রকল্পে প্রায় ৭ হাজার ৮১ জন কর্মকর্তা, কর্মচারী রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকারমূলক ১০ উদ্যোগের একটি হচ্ছে, ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প। ‘রূপকল্প-২০২১’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এটির বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয় ২০০৯ সালের জুলাই মাসে।
দেশের ৪৯০টি উপজেলার ৪ হাজার ৫০৩ ইউনিয়নের ৪০ হাজার ৫২৭ টি গ্রামে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় দেশজুড়ে এ পর্যন্ত মোট ৭৩,৪৬১ টি গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গঠন করা হয়েছে। এতে অন্তর্ভুক্ত পরিবার (সদস্য) সংখ্যা ৩৫,১০,৫৪২ জন। তাদের জমাকৃত নিজস্ব সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২৯১ কোটি ২০ লাখ টাকা। প্রকল্প এলাকা গুলোতে স্বল্প আয়ের পরিবারের সংখ্যা ১৫ শতাংশ থেকে কমে এখন তিন শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে স্বাবলম্বী পরিবারের সংখ্যা ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩১ শতাংশ হয়েছে। সারাদেশে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। প্রকল্প এলাকার উপজেলাগুলোতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে। প্রকল্প সমন্বয়ে রয়েছেন জেলা প্রশাসক।
প্রকল্পটির লক্ষ্য দারিদ্র্র্য দূরীকরণ, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, স্থানীয় সম্পদ আহরন ও তার যথাযথ ব্যবহার, উন্নয়নমূলক ও আয়বর্ধক কর্মকা-ে গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
প্রকল্প পরিচালক আকবর হোসেন জানান, দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বালিয়াকান্দি উপজেলা প্রকল্প সমন্বয়কারী বিধান কুমার দাস জানিয়েছেন, “বর্তমান সরকার দেশব্যাপী গ্রামাঞ্চলে ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্পের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন করেছে। উপজেলায় ২০০৯-১০ অর্থবছরে এই প্রকল্প শুরু হয়। কিন্তু নতুন আঙ্গিকে এর কার্যক্রম শুরু হয় ২০১১-১২ অর্থবছরে। মাত্র ১ হাজার ২০০ জন সদস্য নিয়ে উপজেলায় কাজ শুরু হলেও বর্তমানে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬০৩ জনে। শুরুতে উপজেলায় মোট তহবিল ছিল ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৭৫ টাকা। বর্তমানে মোট তহবিল ১০ কোটি ৫৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা।
তিনি আরও জানান, উপজেলায় এই প্রকল্পে সুবিধাভোগীদের মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় ১৪ কোটি ৪১ লাখ টাকার ঋণ দেয়া হয়েছে। সুবিধাভোগীরা প্রত্যেকে মাসিক ২০০ টাকা হারে প্রায় ৩ কোটি ৩৬ লক্ষ ৩৩ হাজার টাকা সঞ্চয় জমা করেছেন। এছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় ৬ কোটি ৪৪ লাখ ৭৯ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করা হয়েছে।
‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষ এর ব্যাপক সুফল পাচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক মো: শওকত আলী বলেন, “একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প দারিদ্র্য বিমোচনে প্রধানমন্ত্রীর একটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি। রাজবাড়ী জেলায় এই কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ প্রকল্প দারিদ্র্য দূরীকরণে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে।”
বালিয়াকান্দি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব মোঃ মাসুম রেজা বলেন, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প দারিদ্র বিমোচনে একটি রোল মডেল। বালিয়াকান্দি উপজেলায় প্রকল্পটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও সুসৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে তিনি আরও বলেন এপ্রকল্পটির মাধ্যমে অচিরেই বালিয়াকান্দি উপজেলা ক্ষুধা দারিদ্র মুক্ত ও ভিক্ষুক মুক্ত করা সম্ভব হবে।
