সময় ভোর ৫:১৪, বৃহস্পতিবার, ২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৬ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

রাজবাড়ীতে আদালতের নির্দেশে দেড় মাস পর কবর থেকে শিপনের লাশ উত্বোলন -সঠিক ময়নাতদন্ত দাবী পরিবারের

 স্টাফ রিপোর্টার ঃ রাজবাড়ীতে দাফনের দেড় মাস  পর আদালতের নির্দেশে কবর থেকে শহরের চরলক্ষীপুর এলাকার বাসের হেলপার শিপন শেখ(১৭) এর লাশ উত্তোলন করা হয়েছে। গত ১৮ই অক্টোবর সকালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ মহিউদ্দিনের উপস্থিতিতে নতুন বাজার  মুরগীর ফার্ম সংলগ্ন পৌরসভার ১নং কবরস্থান থেকে পুলিশ লাশটি উত্তোলন করা হয় । উল্লেখ্য,গত ৫ই সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ীর পাশে একটি কড়ই গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় শিপনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে শিপনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হলেও ওই সময় রাজবাড়ী থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়।

পূর্বের ঘটনা ঃ রাজবাড়ী শহরের চরলক্ষীপুরে গতকাল ৫ই সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে কড়ই গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় পরিবহন শ্রমিক শিপন শেখ(১৮) এর মৃতদেহ থানা পুলিশ উদ্ধার করেছে। রাজবাড়ী শহরের চরলক্ষীপুরে গতকাল ৫ই সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে কড়ই গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় পরিবহন শ্রমিক শিপন শেখ(১৮) এর মৃতদেহ থানা পুলিশ উদ্ধার করেছে।

সে ওই গ্রামের সামাদ শেখের ছেলে। পরিবারের দাবী শিপনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে মৃত অবস্থায় গাছের ডালের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
নিহতের মা ছাবিয়া বেগম জানান, কোরবানীর ঈদের দুই সপ্তাহ আগে একই এলাকার বাসিন্দা সিআইডি পুলিশ সদস্য হাসানের নির্মাণাধীন বাড়ীর মোটর চুরি হয়। ওই মোটর চুরির সাথে তার ছেলে শিপনসহ ৬জন জড়িত ছিল। মোটর চুরির বিষয়ে সিআইডি পুলিশ হাসান আমার ছেলে শিপনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে চুরির ঘটনা স্বীকার করে এবং অন্যান্য জড়িতদের নাম প্রকাশ করে। এতে ক্ষিপ্ত হয় জড়িতরা। এ জের ধরে গত ৩০শে আগস্ট রাতে একই এলাকার নাদিম ও হাবিব আমার ছেলে শিপনকে মারপিট করে। এরপর থেকে শিপন আর বাড়ি ফেরেনি। তবে তার সাথে মোবাইলে কথা হতো। গতকাল ৫ই সেপ্টেম্বর সকাল ৬টার দিকে বাড়ীর একটু অদূরে কড়ই গাছের সাথে শিপনের মৃতদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।
তিনি দাবী করেন পরিকল্পিতভাবে নাদিম, হাবিব, শান্ত, সোহান, আদর ও তাদের সহযোগিরা তার ছেলে শিপনকে হত্যা করে গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখে।
স্থানীয়রা জানায়, মোটর চুরির অভিযোগে কয়েকদিন আগে হাসান নিজেই শিপনকে মারপিট করে। এ হত্যাকান্ডের সাথে সে জড়িত। এছাড়াও সে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা সাপ্লাই দেয়। পুলিশের লোক হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলার সাহস পায় না। তবে বেশ কিছু দিন আগে ইয়াবা বিক্রির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে রাজবাড়ী থেকে অন্যত্র বদলী করা হয়।
এ বিষয়ে মোবাইলে জানতে চাওয়া হলে সিআইডি পুলিশ হাসান বলেন, আমার বাসার মোটর চুরি হয়েছে। তবে এর বাইরে আমি কিছুই জানি না। আমি কক্সবাজারে কর্মস্থলে আছি। আমার বিরুদ্ধে ইয়াবা বিক্রির অভিযোগও সত্য নয়।
রাজবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ তারিক কামাল জানান, সকাল ১০টার দিকে মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এটি হত্যা না আত্মহত্যা তা এখনই বলা যাচ্ছে না। লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়না তদন্ত হাতে পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। সূত্র ঃ  চরলক্ষীপুর থেকে বাসের হেলপার শিপনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার॥পরিবারের দাবী হত্যাকান্ড॥ময়না তদন্তের জন্য লাশ মর্গে প্রেরণ   

কোর্টে মামলা ঃ  গত ১৮ই সেপ্টেম্বর শিপনের মা সাবিয়া বেগম বাদী হয়ে রাজবাড়ীর বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১নং আমলী আদালতে ৫জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যার মিসপিটিশন নম্বর-২৪৫/১৮। ধারাঃ ৩০২/৩৪ দঃ বিঃ।
মামলার আসামীরা হলো ঃ বাগমারা ঢাকালেপাড়ার কারির ছেলে রাকিব(২০), চরনায়নপুর গ্রামের আজাদের ছেলে আদর(১৯), চরলক্ষীপুর গ্রামর আক্তারের ছেলে সোহেল ওরফে সোহান, ছুরাফ শেখের ছেলে শান্ত শেখ ও ছুবান শেখের ছেলে সোহান শেখ।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, বাবা সামাদ শেখ ও বড় ভাই মিজান শেখ অসুস্থ্য থাকায় শিপন অল্প বয়সেই বাস শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাতো। সে প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতো এবং রাতে বাড়ী ফিরত। ঘটনার কয়েক দিন আগে একই এলাকার এক পুলিশ অফিসারের বাড়ীর পানি উত্তোলনের মোটর চুরি হয়। অধিক রাতে বাড়ী ফেরায় উল্লেখিত আসামীরাসহ তাদের কিছু সহযোগি শিপনকে চুরির সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে ওই পুলিশ অফিসারের বাড়ীতে ধরে নিয়ে যায়। ওই পুলিশ অফিসার মোটর উদ্ধারের দায়িত্ব উল্লেখিতদের ওপর দিয়ে কর্মস্থলে চলে যায়। এরপর উল্লেখিতরা শিপনের কাছে ১০ হাজার টাকা দাবী করে এবং ৩দিনের মধ্যে টাকা না দিলে তারা তাকে লাশ বানিয়ে ঝুলিয়ে রাখবে বলে হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেয়।
গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে কাজ শেষ করে বাড়ীতে এসে খাওয়া দাওয়ার প্রস্তুতি নিলে উল্লেখিতরা এসে শিপনকে ডেকে নিয়ে যায়। এ সময় তার মা সাবিয়া বেগম বাঁধা দিলে তারা জানায় শিপনকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অভিযোগ প্রমাণ না হলে ছেড়ে দেয়া হবে। তবে তারা সাবিয়া বেগমকে বলে যায় শিপনকে সহজে ছেড়ে নিতে হলে ১০ হাজার টাকা লাগবে। এই বলে তারা শিপনকে জোর পূর্বক ধরে নিয়ে যায়। এরপর ওই রাতে সাবিয়া বেগম এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের স্মরণাপন্ন হলে স্থানীয়ভাবে তারা সকালে বসবে বলে ওই সময় পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে বলে। এরপরেও সাবিয়া বেগম উল্লেখিত প্রত্যেকের বাড়ীতে যায়। তবে তাদেরকে না পেয়ে তিনি বাড়ীতে ফিরে আসেন। পরদিন সকালে বাড়ীর পাশে একটি কড়ই গাছের সাথে শিপনের ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়।
এরপর স্থানীয় মাতুব্বরদের খবরে পুলিশ এসে লাশটি উদ্ধার করে। এ সময় আসামী পক্ষের লোকজন পোষ্ট মর্টেম ছাড়াই লাশ দাফন করতে পারবে বলে মৃতদেহ কাটা ছেড়া না করার জন্য সাবিয়া বেগমকে পরামর্শ দিতে থাকে। তখন এলাকার কিছু লোকজনের চাপে শিপনের পোষ্ট মর্টেম করানো হয়। এ ঘটনার পর সাবিয়া বেগম ও তার পরিবারের লোকজন থানায় মামলা করতে গেলে কর্তৃপক্ষ ময়না তদন্ত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মামলা করা যাবে না বলে জানায়।
মামলার এজাহারে আরো উল্লেখ করা হয়, শিপনের পরিবারের লোকজন গোপনে খবর পান আসামী পক্ষের লোকজন পোষ্ট মর্টেম রিপোর্ট ভিন্ন খাতে নেয়ার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। গত ১৩ই সেপ্টেম্বর তারা রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে গিয়ে খবর নেন পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট করা হয়েছে। তবে অজ্ঞাত কারণে সেটি আটকে আছে।
সাবিয়া বেগমের ধারণা তার ছেলে শিপনকে উল্লেখিতরা পূর্ব পরিকল্পনা করে হত্যা করে এবং আত্মহত্যা দেখানোর জন্য শিপনের লাশ গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখে।

অনুসন্ধানঃ ঘটনার পর শিপন হত্যার দাবী করে নিহত শিপনের পরিবার । শিপনের মা – তিনি দাবী করেন পরিকল্পিতভাবে নাদিম, হাবিব, শান্ত, সোহান, আদর ও তাদের সহযোগিরা তার ছেলে শিপনকে হত্যা করে গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখে। কিন্তু , মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয় ঃ বাগমারা ঢাকালেপাড়ার কারির ছেলে রাকিব(২০), চরনায়নপুর গ্রামের আজাদের ছেলে আদর(১৯), চরলক্ষীপুর গ্রামর আক্তারের ছেলে সোহেল ওরফে সোহান, ছুরাফ শেখের ছেলে শান্ত শেখ ও ছুবান শেখের ছেলে সোহান শেখ।প্রভাবশালীদের চাপে  ঘটনা অন্য দিকে প্রবাহের অনুমান করেছে এলাকাবাসী।

শিপনের মা দাবী করেছিলেন স্থানীয় সি আই ডি হাসানের মটর চুড়িই ছিলো তার ছেলে হত্যার মূল কারন । এদিকে শিপনের বাবা জানান, আমার এক ছেলে গেছে ,অন্য ছেলে যাক আমি চাই না । আমাকে বিভিন্ন ভাবে ভয় ও হুমকি দেয়া হচ্ছে , যদি আমি এ বিষয়ে মামালা ,বা অন্য কিছু করি তাহলে আমার আরেক  ছেলেকে খুন করা হবে ।   

রাজবাড়ী থানার এস.আই বদিয়ার রহমান জানান- শিপনের পরিবার আদালতে হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করলে আদালত লাশটি উত্তোলন করে মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য পুনরায় ময়না তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে গতকাল ১৮ই অক্টোবর সকালে লাশটি কবর থেকে উত্তোলন করে পুনরায় ময়না তদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করা হয়।

 

সম্পাদকঃ  অনুজিত সরকার
প্রকাশকঃ মুহাম্মদ রকিবুল হাসান
ই-মেইলঃ [email protected]

কপিরাইট © ২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক রাজবাড়ী